ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিস্ময়কর ইতিহাস
ভূমিকা
ভাবুন তো কেউ শুধু মসলা কিনতে এসে একটি পুরো দেশ দখল করে নিল! শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও ইতিহাসে এমনটাই ঘটেছিল। এই অবিশ্বাস্য কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু হলো East India Company যারা ব্যবসার অজুহাতে এসে ধীরে ধীরে ভারতবর্ষসহ এশিয়ার বিশাল অংশে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।
সূচনা:
১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের একদল ব্যবসায়ী রাণী এলিজাবেথ-১ (Queen Elizabeth I) এর কাছে পূর্ব দিকে (ভারতবর্ষে) ব্যবসা করার অনুমতি চেয়ে একটা প্রস্তাব নিয়ে আসে। এতে তিনি অনুমতি দিয়ে দেন। তাদের লক্ষ্য ছিল সহজ পূর্ব দেশগুলো থেকে মসলা সংগ্রহ করে ইউরোপে বিক্রি করা।

একদম সাধারণ প্ল্যান ইস্টে যাব, মসলা আনব এবং ইউরোপে বেচব। কোম্পানির নাম দেওয়া হয়: দ্যা গভর্নর অ্যান্ড কোম্পানি অফ মার্চেন্টস অফ লন্ডন ট্রেডিং ইন দ্য ইস্ট-ইন্ডিজ (The Governor and Company of Merchants of London Trading into the East Indies)। বা আমরা যাকে ইস্ট ইন্ডিয়া নামে চিনি। তবে তখনও ইংল্যান্ড আন্তর্জাতিক ব্যবসায় অতো ভালো ছিল না। তখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেমন ডাচ, পর্তুগাল এবং স্পেন বিশ্ব বাণিজ্যে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল।
স্যার জেমস ল্যাঙ্কাস্টার (Sir James Lancaster) নামে এক লোক ছিল। তিনি ৪টি জাহাজ নিয়ে তাদের প্ল্যান অনুযায়ী ইস্টের দিকে রওনা হন। প্রথমে তিনি ভাবেন ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার জন্য। কিন্তু সেখানে ডাচদের নিয়ন্ত্রণ থাকায় তারা ইন্দোনেশিয়ার ধারের কাছেও যেতে পারে না।
তখন তাদের নজরে আসে ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়া অতো ভালো মসলা না পাওয়া গেলেও খালি হাতে ফেরার চেয়েও ভালো ছিল। তাই তারা ইন্ডিয়াতে এসে অনেক চিন্তাভাবনা করে দেখল, এখানে মসলা না পাওয়া গেলেও টেক্সটাইল আইটেম যেমন সুতা, কাপড়-চোপর অনেক ভালো পাওয়া যায়। তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের ব্যবসার পরিকল্পনা পরিবর্তন করে।
তখন ভারতবর্ষে ছিল মুঘল শাসন আমল। মুঘল সাম্রাজ্যের একজন সম্রাট ছিলেন জাহাঙ্গীর। স্যার জেমস অনেক উপহার নিয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে যান। তার উদ্দেশ্য ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ব্যবসা ও অফিস সেট-আপ করার অনুমতি নেওয়া। প্রথমে তারা সুরাট, বম্বে, মাদ্রাস ও কলকাতায় তাদের অফিস সেটআপ করার অনুমতি পায় মুঘল সাম্রাজ্য থেকে।
এই কয়েক দশক ধরে তারা ব্যবসা পরিচালনা করতে থাকে। আস্তে আস্তে কোম্পানি বড় হতে থাকে। এতে মুঘল সাম্রাজ্যের কোনো মাথাব্যথা ছিল না কারণ তারা বড় মাপের ট্যাক্স পাচ্ছিল এবং দেশে বিভিন্ন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল। কোন কোন গ্রামে প্রতি ১০ জনের ৪ জনই এই কোম্পানিতে চাকরি করত। আবার কোনো জায়গায় ১০ জনের ১০ জনই চাকরি করত। ইংল্যান্ড থেকে বড় বড় জাহাজ এনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কাপড়-চোপর নিয়ে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে তারা আবিষ্কার করল যে ভারতেও মসলা উৎপাদন করা সম্ভব। তাই তারা মসলার কারবারও শুরু করল।
এইভাবে ব্যবসা ভালোই চলছিল। এর মধ্যে ১৭০৭ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেব মারা যান। তার মৃত্যুতে মুঘল সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৭১৭ সালে সম্রাট ফারুকের সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটা ডিল হয়। ডিলটি হলো বেঙ্গল এবং মাদ্রাস এই দুই জায়গায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে কোনো ট্যাক্স দেওয়া লাগবে না। এতে কোম্পানিটি আরো ফুলে-ফেঁপে ওঠে এবং অনেক টাকা পয়সার মালিক হয়ে যায়।
সামরিক শক্তি বৃদ্ধি
ইতিমধ্যেই তারা অনেক গার্ড নিয়ে আসে কারণ তাদের ফ্যাক্টরি ও অফিস পাহারা দেওয়ার জন্য। মুঘল সাম্রাজ্য দুর্বল হওয়ার কারণে আঞ্চলিক পাওয়ারগুলো শক্তিশালী হতে থাকে। ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মনে করে মুঘল সাম্রাজ্য তাদেরকে যথেষ্ট নিরাপত্তা দিতে পারবে না। তাই তারা তাদের আর্মি বড় করা শুরু করে। এক পর্যায়ে ৫০ হাজারেরও বেশি আর্মি হয়ে যায়। তখন মুঘলদেরও এত আর্মি ছিল না। অপরদিকে এই কোম্পানির আর্মিরা আধুনিক অস্ত্রে-সস্ত্রে সুসজ্জিত ছিল।
পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭)
তখন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ব্রিটিশদের এই উত্থান পছন্দ করেননি। ১৭৫৭ সালে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং ফোর্ট উইলিয়াম নামের একটি ফোর্ট দখল করেন। এর ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ যান নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে মোকাবেলা করার জন্য। বিশাল যুদ্ধ হয় এবং মীর জাফরকে হাত করে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করা হয়। এই যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জিতে যায় এবং মীর জাফরকে রাজা বানানো হয়। এইটিই ছিল পলাশীর যুদ্ধ।
মীর জাফর রাজা হলেও আসলে ওই অঞ্চল শাসন করত ব্রিটিশরাই। কারণ তারাই মীর জাফরকে রাজা বানিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রথম তারা বাংলা দখল করে। তারপর তারা প্রথমেই যেই কাজ করে সেটি হলো বাংলা থেকে বিভিন্ন সম্পদ লুট করা। আজকের হিসেবে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার শুধু স্বর্ণই লুট করেছে। শুধু স্বর্ণই নয় তাদের কাছে যা ভালো লাগত তাই ব্রিটেনে পাচার করত। পুরো বাংলা একদম খালি করে ফেলে। শুধু তাই না, তারা জনগণের উপর ৩০ শতাংশ ট্যাক্স আরোপ করে। নীল চাষে মানুষকে বাধ্য করা হয় এবং মানুষের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। তারা বিভিন্নভাবে মানুষকে শোষণ করতে থাকে। এইভাবে তারা একের পর এক অঞ্চল দখল ও শোষণ করতে থাকে।

মসলা কিনতে আসা একটা সাধারণ কোম্পানি তখন রাজা হয়ে যায়। একটা রাজার দুইটা চিন্তা থাকে ১। কিভাবে আমার রাজত্ব ঠিক রাখব? ২। কিভাবে আমার রাজত্ব বড় করব? এই কোম্পানিরও একই চিন্তা ছিল। তারা পুরো ভারতবর্ষ দখল করার চিন্তা করে। এই জন্যে আরো সৈন্য বৃদ্ধি করা শুরু করে। এতে ভারতবর্ষে অনেক স্থানীয় সুবিধাবাদি মানুষও সিপাহী হিসেবে যোগ দেয়।
বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪)
১৭৬৪ সালে মুঘল সম্রাট শাহ আলম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। এই যুদ্ধে তিনি খুবই বাজেভাবে পরাজিত হন। ফলে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে চলে যায়। এই যুদ্ধকে বক্সারের যুদ্ধ বলা হয়।
বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা দখল করার পর তারা আরো ভয়ংকর হয়ে যায়। আরো জুলুম-নির্যাতন ও লুটতরাজ শুরু করে। এতে ভারতবর্ষে দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। এক সময় শীর্ষ ধনী রাষ্ট্র থাকলেও শুধু ব্রিটিশদের এই অনাচারের কারণে না খেতে পেয়ে প্রায় ১ কোটি মানুষ মারা যায়। এই অবস্থা দেখে তখনকার বিভিন্ন মুঘল সম্রাটরা ও অনেক আঞ্চলিক সম্রাটরা যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এই যুদ্ধে টিপু সুলতানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এভাবে আরও অনেক ছোট-বড় আঞ্চলিক যুদ্ধ হয়।
শুধু তাই না তারা আশেপাশে যে সকল দেশে ইউরোপের বিভিন্ন কোম্পানি যেমন ডাচ, পর্তুগিজ, স্পেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদেরকেও সরিয়ে দিয়ে নিজেরা দখল করে নেয়। মাত্র ২শ বছরে ১৮০০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কোম্পানি হয়ে যায়।
সিপাহী বিদ্রোহ ও পতন (১৮৫৭)
এইভাবে দশকের পর দশক চলতে থাকে শাসন-শোষণ, অত্যাচার ও লুটপাট। ১৮৫৭ সালে ঘটে ঐতিহাসিক Indian Rebellion of 1857। ভারতী সশস্ত্র সিপাহী বাহিনী বিদ্রোহ করেন, যা আমরা সিপাহী বিদ্রোহ নামে জানি। এর সূচনা হয় মূলত কয়েকটি কারণে-
- নতুন রাইফেলের কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি ব্যবহার করা, যা হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে।
- ভারতীয় সৈন্যদের প্রতি অবিচার, অসম বেতন ও বৈষম্যমূলক আচরণ।
- কোম্পানির অত্যাচারী করনীতি, জমির দখল, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সাংস্কৃতিক অবমাননা।
এই বিদ্রোহ পুরো ভারতের মানুষকে নাড়া দেয়। পরে সিপহীদের সাথে সাধারণ মানুষ, কৃষক, জমিদার, ধর্মীয় নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণির লোক এই বিদ্রোহে যোগ দেয়। টানা ১ বছর বিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বিলুপ্ত ঘোষনা করে। ১৮৫৮ সালে ভারতবর্ষ শাসনের দায়িত্ব সরাসরি ব্রিটিশ সরকারে নিয়ে নেয়। আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ২৫৮ বছরের ইতিহাস সমাপ্ত হয়।
শিক্ষা
- একটি ছোট ভুল সিদ্ধান্তও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে
- অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও বিভক্তি বাইরের শক্তিকে সুযোগ দেয়
- ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার পথ তৈরি করে
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইতিহাস আমাদেরকে দেখায় যে লোভ, অপক্ষমতা আর একটি ছোট ভুল সিদ্ধান্ত কিভাবে শত বছরের দুঃশাসনে রূপ নিতে পারে। মসলা কিনতে আসা সাধারণ কোম্পানি কিভাবে পর্যায়ক্রমে দুঃশাসন গড়ে তুলতে পারে। মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতা, স্থানীয়দের বিভক্তি ও বিশ্বাসঘাতকতা এবং ব্রিটিশদের কৌশলী বুদ্ধিমত্তা মিলেই তারা একসময় ভারতবর্ষের নিয়তি নির্ধারণ করতে শুরু করে।

পলাশীর যুদ্ধ, বক্সারের যুদ্ধসহ ছোটখাটো অসংখ্য যুদ্ধ ও সংঘাত, টানা শোষণ, লুটপাট, দুর্ভিক্ষ সব মিলিয়ে ভারতবর্ষের মানুষকে অসীম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। একসময় পৃথিবীর সমৃদ্ধতম অঞ্চলগুলোর একটি ছিল ভারতবর্ষ। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অমানবিক অত্যাচার এই সমৃদ্ধিকে ধ্বংস করে দেয়।
অবশেষে অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষ যখন ঘুরে দাঁড়াল, সিপাহীরা যখন বিদ্রোহ শুরু করল এবং সকল স্তরের জনগণ যখন এক হলো, তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অবসান হয়। কিন্তু তারা রেখে যায় শোষণের ক্ষতচিহ্ন, বেদনার ইতিহাস এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
উপসংহার
এই দীর্ঘ সময়ের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় কোনো জাতি যদি নিজের শক্তি, ঐক্য ও নিজেদের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে বাইরের অপশক্তি সুযোগ পেলে হায়নার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আবার একই সঙ্গে ইতিহাস শেখায়। দুঃশাসন যতই শক্তিশালী হোক, মানুষের প্রতিবাদ ও স্বাধীনতার ইচ্ছার সামনে তা একসময় পরাজিত হতেই হয়।